★ Grathor.com এ আপনিও ✍ লেখালেখি করে ভূমিকা রাখতে পারেন এবং পাশাপাশি অর্থ আয় করতে পারেন★এখানে ক্লিক করে বিস্তারিত জানুন★

দুঃসময়ের স্মৃতি-শুধু কী কাঁদায়?

আজ এই মুহূর্তে নিজের পিসি এর সামনে বসে যখন এই লেখাটা লিখতে বসলাম, তখন বারবার মনে হচ্ছে –কেমন হতো যদি এমন না হতো?? সত্যি অবাক হওয়ার মতো। তখন কেমন ছিলাম আমি?? আজকে যেমন আছি তেমন তো ছিলাম না। সকালে নাস্তা খেয়ে ছুটতাম টিউশনি তে। আজকের দিনে টিউশনি হলো এক আতংকের নাম। গিয়ে বসে থাকতাম। মেয়েটা চোখ দলতে দলতে হেলে দুলে আসতো।প্রথম কথা ছিলো, “ম্যাম, আপনি এত তাড়াতাড়ি আসেন কেন?” কিছু বলতাম না। ওকে পড়াতে বসার সাথে সাথে শুরু হতো ওর আম্মার বকবকানি। “সারাদিন কোনো পড়ালেখা নেই। টাকা গুলো সব জলে গেলো! “ প্রতিদিনের রেওয়াজের মতই এই কথা গুলো আমাকে শুনতে হতো।

 

এরপর বাসায় ফেরা। এই আসা-যাওয়ার পথটা আমার কাছে পুলসিরাতের সেই সেতুর মতো লাগতো। রাস্তার সকল পুরুষ-মহিলা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। তাদের সেই দৃষ্টিতে আমার জন্য করুণা ছাড়া আমি আর কিছুই দেখতাম না। না, আমি দেখার মতো সুন্দর ছিলাম না। কালো,মোটা ও বেঁটে আমার দিকে তবুও চেয়ে থাকতো। আর এই চেয়ে থাকাকেই আমি বেশি ভয় করতাম।মানুষের মুখের কথার চাইতে চোখের দৃষ্টিই সবচে ভয়ংকর।


 

এই পথ পেরিয়ে আমি বাসায় আসতাম সকাল ১০ টায়। বিকেল ৪ টা পর্যন্ত একটানা বাসায় বন্দি জীবন। মায়ের বিষাদ মাখা মুখ। বাবার দুশ্চিন্তায় –হতাশা গ্রস্ত মন। বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে মেয়ের। বাবা-মা কিভাবে হাসিমুখে থাকেন? তবুও আমি তাদের ভরসা দিই ,” এবার তো আমার চাকরি হবেই।“ কিন্তু এইচ এস সি পাশ করা মেয়ের চাকরি পাওয়া কী এতোই সহজ। আমার বাবা-মা আমাকে কখনো বলেন নি যে, আমি তাদের বোঝা হয়ে আছি। শুধু তাদের একটাই কথা, আমার ভবিষ্যৎ কী হবে? আমি বলতাম, চিন্তা নেই। আল্লাহ সবার রিজিক নির্ধারিত করে রেখেছেন।

আমি আল্লাহর কাছে বলতাম,”হে আল্লাহ, আমার পিতামাতার আগে আমার মৃত্যু তুমি করিয়।“ আমার মৃত্যু হয়তো তাদের কয়েকদিন কষ্টে রাখবে।কিন্তু তাদের মৃত্যু হলে আমি এক সেকেণ্ড বাঁচতে পারবো না। এতো হতাশায় পড়ে থাকা সত্ত্বেও আমার কখনো আত্মহত্যা করার কথা মাথায় আসে নি। সবসময় বই পড়তাম।


সাতকাহন বইটা পড়ার পর নিজের ভিতরে কেমন একটা শক্তি বোধ করলাম। কম্পিউটার সেন্টারে গিয়ে ভর্তি হলাম। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন করে গেলাম। সবার আগে আমার কাজ শেখা হলো। আমি সেখানে কয়েকজনকে শেখাতে আরম্ভ করলাম। ইচ্ছে ছিলো নিজের গ্রামে গিয়ে নিজেই একটা ট্রেনিং সেন্টার খুলবো।

এলাকার সরকারি প্রাইমারিতে গেস্ট টিচার হিসেবে যোগ দিলাম.৯-৪টা ক্লাশ। মাস শেষে স্যার আমার হাতে মাত্র ১৫০০ টাকা তুলে দিলেন। সেদিন যে আমার কিরকম অপমান বোধ হলো তা আজো কাউকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি স্যারকে কিছুই বলিনি। আসলে সেদিন হয়তো বলার মতো আমার কোনো ভাষা ছিলো না। সব টিচারদের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে সেদিনের জন্য বিদায় জানিয়ে বাসায় এসে কিছুক্ষণ নিজে নিজে কাঁদলাম। বারবার মনে হল, কেনো যে মধ্যবিত্ত হলাম? সেদিনের পর দিনেই আমার চাকরির খবর আসলো। আমার বাবা-মা, ভাই-বোন সকলেই কি পরিমাণ খুশি হয়েছে তা লিখতে গেলে কয়েক হাজার পৃষ্ঠা লাগবে।

আপনার সুখের সময় কিন্তু বেশি বেশি খুশির খবর আসবে। দুঃখের সময় খারাপ খবরটা আসতেও কুণ্ঠা বোধ করবে।

আমার যখন চাকরি ছিল না,আমি যখন বেকার ছিলাম তখন কেউ আমার পাশে আসে নি। আমার বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, কেউ তার খবর নেয নি। এখন আমার চাকরি হয়েছে , এখন চতুর্দিক থেকে সুসময়ের কোকিলদের আনাগোনা বাড়ছে। আমার বাবা-মা এসব কাক- কোকিলদের দিকে ফিরেও তাকান না। তাদের কথা, মেয়ে আমাদের স্বাবলম্বী। সে যা করবে তার নিজের মতে করবে। এতো দিন মেয়ে আমাদের যুদ্ধ করেছে ,তখন তো কেউ মেয়ের পাশে আসে নি। এখন চাকরি হওয়ার পরে কেনো এতো বাড়াবাড়ি? আমি আমার বাবা-মায়ের এই কথায় সম্মতি প্রদান করেছি। আমি আমার বাবা মায়ের সাথে থাকতে চাই আজীবন।

আমি জানি, আমার দেশের অনেক মেয়েই এসব কারণে খুব হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আমি তাদের বলবো, হতাশ হওয়ার দরকার নেই। আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে। তখন ফেসবুক ছিলো কিন্তু সার্চ ইংলিশ বা ডিএসবি গ্রুপের মতো কোনো গ্রুপ ছিলো না। যদি থাকতো তখন আমি হয়তো আরো আপডেট হতে পারতাম।

আমি জানি না, আমার লেখাটা কোন ক্যাটাগরিতে পড়েছে? তবে আমার দু;সময়ের স্মৃতি হিসেবে এই স্মৃতি আমি আজীবন স্মরণে রাখবো। এখনো এই দুঃসময়ের স্মৃতি গুলো আমাকে শক্তি যোগায়। যখন অকারণে মন খারাপ হয়, তখন আমি সেই সময় গুলোকে স্মরণ করি।

বর্তমানে তরুন-তরুনিরা কত সহজেই হতাশ হয়ে যায়। ভাবলেই অবাক লাগে।  আমাদের সময়ে আমরা ১-২ টাকা নিয়ে স্কুলে যেতাম। তাও প্রতিদিন আমাদের তাকা দেওয়া হত না। সপ্তাহে ২-৩ দিন। সেই টাকা গুলিও আমরা খরচ করতাম না। মাটির ব্যাংকে জমাতাম। ঈদে খরচ করব বলে।

দুঃসময়ের সেই স্মৃতি গুলো স্মরন করলে এখন ভালোই লাগে। মনে হয় , আগেই তো ভালো ছিলাম। ঈদের দিন কতই না মজা করতাম। মেলায় যেতাম, বাজী ফুটাতাম আরো কত কিছু।

তখনকার দিনের কষ্ট গুলো এখন বড় মধুর মনে হয়।  একসময় খুব হতাশায় কাটত । বন্ধু ছিলো না, টাকা ছিলো না, সময়? তাও ছিলো না। এখন তো সব আছে। টাকা , বন্ধু ,সময় ………সব। তবুও মনে হয় কি যেন নেই?

 

 

 

 

11 Comments

মন্তব্য করুন