বাস্তব জীবনের গল্প

 

বাস্তব জীবনের গল্প বলি…কারণ এখন যে আমাকে সবাই দেখে তার পেছনের আমার গল্পটা কেউ জানে না…

ছোটবেলা থেকে খুব নির্মমভাবে আমার মাথায় আমার আত্মীয়রা যে কথা ঢুকিয়ে দিয়েছিলো, সেটা হলো, আমি সুন্দর না…আমি এই কথা মেনে নিয়ে জীবন পার করে ফেলেছি…

সবকিছু ছেড়ে দিয়ে আমাকে শুধু লেখাপড়া করে মানুষ হতে হবে, এর বাইরে আমার নিজের পৃথিবী বলে কিছু থাকবে না, এটাই ছিলো তখনকার কাম্য ভবিতব্য কারণ আমার আর কোন গুণ নেই, আমার বাবার কোন টাকা নেই, কারণ আমি ছিলাম কালো!

স্কুলে পড়তেই পেটে গুঁতো দিতো মেয়েরা দুষ্টুমি করে…কী রে কয়টা এখানে? লজ্জায় কুঁজো হয়ে থাকতাম…তিন বেলা ভেতো বাঙালি আমি…ফিগার নিয়ে কখনোই ভাবি নি…সকালে কী খেয়ে এসেছো জিজ্ঞেস করলে মিথ্যে বলতাম, টোস্ট বা রুটি!

একদিন স্কুল বাসে এক জুনিয়র মেয়ে আমার হাত ধরে সাথে সাথে ছেড়ে দিয়ে বললো, ‘ইয়া আল্লাহ আপু! তোমার হাত এতো শক্ত কেন? তোমার তো জীবনেও বয়ফ্রেন্ড হবে না! কেউ তোমার হাত ধরে থাকতেই পারবে না!’

<

আমি কষ্ট পেয়েছিলাম…হাত দিয়ে কী মাটি কাটো? এ ধরনের প্রশ্ন আমাকে প্রচুর শুনতে হয়েছে…আমার হাত দুটো অন্যান্য মেয়েদের মত স্বাভাবিক নরম কোমল নয়, এর কারণে জীবনের পথে কেউ আমার হাত ধরবে না, এই যুক্তি আমাকে তখন ভাবিয়েছিলো!

ঢাবিতে এসে নিজের ডিপার্টমেন্টের এবং বুয়েটের কিছু ছেলেমেয়ের সাথে ভালো সখ্যতা হলো…তখনো আমি নিজেকে নিয়ে সংকুচিত হয়ে থাকতাম…সেই বন্ধুদের প্রত্যেকে আমাকে বলেছিলো, তুই যা, তুই তা-ই থাক, তুই এমনিতেই সুন্দর…তারা আমাকে কবিতা লিখতে উৎসাহ দিতো, বইমেলায় লিটল ম্যাগে লেখা ছাপা হলে কিংবা প্রতিযোগিতায় কবিতা লিখে পুরস্কার জিতে আনলে তারা সেটা সেলিব্রেট করতো…আমি এরপর সাঁতার শিখতে চেয়েছি, ভায়োলিন শিখতে চেয়েছি, আবৃত্তি শিখতে চেয়েছি, তারা সবকিছুতে আমার শক্তি হয়ে পাশে পাশে থেকেছে…আমার বাবা-মাও কখনোই আমার পড়াশোনার বাইরের কাজে আমাকে বাধা দেয় নি…আলহামদুলিল্লাহ!

চাকরি জীবন আমাকে টানে নি..চাকরি ছেড়ে  Artista তে ওয়াল পেইন্টিং শুরু করলাম, ঘোরাঘুরির নেশা আর স্বেচ্ছাসেবী কাজও বন্ধ ছিলো না কখনো..যা-ই করি, আমার ভাই বলেছে, আপু কর…থামিস না…

অনেক পরে সাইক্লিং শিখেছি…এখন মেয়েদেরকে সাইক্লিং শেখাচ্ছি, সাইক্লিং এর জন্য  School of Cycling: Femina স্কুলটা করতে পেরেছি এই পরিবার-বন্ধুদের সাহসে ভর করে…সাইক্লিং এর পর জন্ম হলো  Phoenix’s Wonder Women এর…এই স্কুলে মেয়েদের ইচ্ছেপূরণের জায়গা আরো বড় হলো…নাচ, গান, গিটার, ভায়োলিন, উকুলেলের পাশাপাশি শুরু হলো ইংরেজিতে পাবলিকলি জড়তাহীন কথা বলা, আরবি শুদ্ধ উচ্চারণ ও কুরআন তিলাওয়াত, বাংলা শুদ্ধ উচ্চারণ ও আবৃত্তি..শুরু হলো আর্থিকভাবে সাবলম্বী হবার জন্যে স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্স, ফটোগ্রাফি, গ্রাফিক্স ডিজাইনিং..যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে নিজেকে গড়ে তুলতে সেল্ফ ডিফেন্স কোর্স..মোট কথা, মেয়েরা যা যা শিখতে চায়, তা-ই!

যেসব মেয়ে কালো, মোটা, খাটো, বলে সংকোচে ভোগে, আমি তাদের কাউকে দোষ দিই না…কারণ এই জায়গাটা আমি পার করে এসেছি, আমি জানি, মেয়েদের গায়ের রঙ, মেয়েদের শরীর আমাদের সমাজের অন্য ছেলেমেয়েদের কাছে কতখানি স্ট্যান্ডার্ডের মাপকাঠি…আর এ কারণেই বেশিরভাগ মেয়েদের গ্রুপে গিয়ে যখন দেখি ৯০ ভাগ সময়ে সাজুগুজুর বাইরে কেউ কথা বলে না, তখন অবাক হই না…এ কারণেই যখন দেখি নারীবাদী ম্যাগাজিনে বুদ্ধিভিত্তিক প্রাণবন্ত চর্চার বাস্তবিক লেখার বড় অভাব, এরচেয়ে লাইফস্টাইল, রাশিফল নিয়ে প্রকাশিত সংখ্যার কাটতি বাজারে বেশি তখন আদতেই আর অবাক হই না…

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে মানুষগুলো আমাকে বদলে দিয়েছিলো, বিশ্বাস করিয়েছিলো যে আমিও আমার মত করেই সুন্দর, হয়তো এই হতভাগ্য মেয়েরা তাদের জীবনে এমন মানুষের দেখা খুব বেশি পায় নি…আমি তাই চেষ্টা করি, তাদেরকে যেন এই সুযোগটুকু দিতে পারি, যেটা আমার শুরুর সময়ে পাই নি…

নারীসাম্যতার চেয়ে নারীশক্তিতে আমি বেশি বিশ্বাস করি…কারণ সাম্যতা আসবে মানসিক-শারীরিক-বুদ্ধিভিত্তিক শক্তির বিকাশে, যে বিকাশে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে আমাদের পরিবার আর প্রিয় মানুষগুলো…

আমাদের কন্যারা তাই আজ থেকে রোজ নতুন করে ছেলেবেলার কবিতা জানুক, নারীদিবসে এটাই আমার প্রার্থনা-

Mirror mirror on the wall,
It doesn’t matter if I’m short or tall.
If I have skinny legs or my hips are wide,
It only matters who I am inside.
Blue eyes, brown eyes, black or green
What makes me most beautiful cannot be seen.
When you look at me don’t judge me by my parts
‘Cause the most beautiful thing about me is my heart!

Related Posts

12 Comments

মন্তব্য করুন