রাজধানীর সায়দাবাদ বাসস্ট্যান্ডে অভিনব প্রতারণা

রাজধানীতে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে নিত্য নতুন প্রতারণা। একেক সময় একেক ধরণের প্রতারণার জাল বিছিয়ে কার্যসিদ্ধি করে চলেছে এসব প্রতারকচক্র। মাঝে মধ্যে এসব প্রতারকচক্রের কেউ কেউ পুলিশের হাতে ধরা পরলেও কদিন পরেই জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও ফিরে যায় পুরনো ধান্ধায়। ফলে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছেনা এসব প্রতারক চক্রকে। অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, ছিনতাই ইত্যাদি অপরাধগুলো অনেকটাই পুরনো হয়ে গেছে মানুষের কাছে। তাই নিত্য নতুন পরিকল্পনা সাজিয়ে মাঠে নেমেছে এসব অপরাধী চক্র। গত কয়েকদিন আগে সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে বাগেরহাট যাওয়ার উদ্দেশে ইমা পরিবহনের একটি গাড়িতে বসে আছেন নজরুল দম্পতি। সঙ্গে তাদের ৫ বছর ও ১০ বছর বয়সী দুটি পুত্র সন্তান। বাস সকাল সাড়ে সাতটায় ছাড়ার কথা থাকলেও এখন সকাল সাড়ে আটটা বেজে গেছে প্রায়। কিন্তু বাস ছাড়ার কোনো তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে না । অধৈর্য হয়ে পড়া কিছু যাত্রী গাড়ি ছাড়ার জন্য বারবার উচ্চৈস্বরে চিৎকার করছিল। কিছুক্ষণ পর পর পাওরুটি, কলা, আমড়া, আচার, ঝালমুড়ি, নিউজ পেপার, ঘড়ি, হেডফোনসহ বিভিন্ন পণ্যের হকার আসতে লাগল। নজরুল সাহেব স্ত্রী ও বাচ্চাদের জন্য আমড়া ও আচার কিনলেন। ও এমন সময় মাঝ বয়সী এবড়ো থেবড়ো চুলের এক ব্যক্তি গাড়িতে উঠলেন। তার হাতে পেপারে মোড়ানো একটি প্যাকেট। লোকটি সরাসরি এসে নজরুল সাহেবের স্ত্রীর কানের কাছে এসে বললেন- ‘আপা শাড়ি রাখবেন! নতুন শাড়ি! একেবারে টানা মাল। এইমাত্র দোকান থেকে টাইনা আনছি(চুড়ি করে আনছি)। ১২ টা শাড়ি আছে। ঐ পাশের আপায় পনের’শ টাকা কইছে আমি দেই নাই। দেহেন আপা একেবারে ইনটেক জামদানি শাড়ি! নজরুল সাহেবের স্ত্রী যেন আকাশ থেকে পড়ল। কি বলে লোকটা! নিজেই স্বীকার করছে চুরি করে এনেছে! পরক্ষণেই তিনি ভাবলেন ১২টি শাড়ি পনেরশ টাকা! এতো পানির দাম! ভাবলো একটু দেখে নিই। নজরুল সাহেব ও তার স্ত্রী দেখতে চাইলে লোকটি বান্ডেলের একটা পাশ থেকে একটুখানি পেপার ছিঁড়ে শাড়ির অংশ বিশেষ দেখালো আর বলল আপা তারাতারি করেন। এইহানে এতো ভালো কইরা দেখা যাইব না। বুঝেন না এইমাত্র টাইনা আনছি। নজরুল সাহেব ও তার স্ত্রী একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। চুরির মাল কেনাটা ঠিক হবে কি না ভাবছেন। আবার এটাও ঠিক যেখানে একটি শাড়ির দামে ১২টি শাড়ি পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে এ সুযোগটাও হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। আমরা না কিনলেও অন্য কেউ না কেউতো এই শাড়িগুলো কিনবেই। স্ত্রীর মুখে এই কথা শুনে নজরুল সাহেবও চিন্তায় পড়ে গেলেন। স্ত্রীকে আস্তে আস্তে বললেন, একসাথে ১২টি শাড়ি দিয়ে আমরা কি করবো? স্ত্রী তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন -আরে আমরা সবগুলো রাখতে যাবো কেন? বাড়ি নিয়ে গিয়ে আমরাতো একটা শাড়িই হাজার বারো’শ টাকায় বিক্রি করতে পারবো। আমরা দুই একটা রেখে কিছু কাপড় বিক্রি করে দেব। আবার চাইলে কাউকে কাউকে গিফটও করতে পারবো। এবার নজরুল সাহেব কিছুটা চিন্তামুক্ত হলেন। হ্যা তাহলেতো ভালোই হয়। নিজেদের শাড়ি হলো আবার কিছু বাড়তি টাকাও হলো। সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি রাখবেন। কিন্তু লোকটি যে দাম বলেছে ঠিক সেই দামেই কিনতে হবে কেন? একটু দাম দর করে দেখি না। এই ভেবে নজরুল সাহেব বিক্রেতাকে বললেন পনের’শ(১৫০০) না এক হাজার(১০০০) টাকা পাবা, হইলে দাও। লোকটি বললো ভাই ঠিক আছে তারাতারি টাকা দেন বাস ছাইড়া দিব। নজরুল সাহেবের স্ত্রী নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ১০০০ টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দিলেন। লোকটি টাকাটা সামান্য চেক করে হনহন করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। নজরুল দম্পতির মনে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। আবার কম দামে ১২টি শাড়ি পাওয়ায় কিছুটা আনন্দও রয়েছে মনে মনে। ততক্ষণে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। গাড়িটি মাওয়ার কাছাকাছি আসার পর নজরুল সাহেবের স্ত্রী বলল এই চলো না প্যাকেটটা খুলে দেখি। আমি কোনটা কোনটা রাখব, কোনটা কাকে গিফট করব একটু দেখে নিই। নজরুল সাহেব সায় দিলেন। অতঃপর পেপারে মোড়ানো শাড়ির প্যাকেট খুলে যা দেখা গেল তাতে নজরুল দম্পতির চোখ কপালে উঠে গেল। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। প্যাকেট খুলে দেখা গেল পুরোনো শাড়ি কাপড় ও থ্রিপিছের কাপড়ের টুকরো দিয়ে কিছু সংবাদপত্রকে শাড়ির মতো করে পেচিয়ে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কয়েকটি খবরের কাগজ শাড়ির মতো ভাজ করে তার উপর শাড়ি কাপড়ের টুকরো দিয়ে পেঁচিয়ে ১২টি প্যাকেট বানানো হয়েছে। আসলে ভিতরে কোনো শাড়ি কাপড় নেই আছে শাড়ি কাপড়ের আদলে সংবাদপত্রের কাগজ। একে একে তারা দেখল পুরনো শাড়ি কাপড় আর থ্রিপিছের নোংরা টুকরো কাপড়ে মোড়ানো ১২টি সংবাদপত্রের প্যকেট। অবশেষে তারা বুঝল তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। আসলে এগুলো চুরি করে আনা নতুন শাড়ি নয় এগুলো নিরিবিলি বাসায় বসে ঠান্ডা মাথায় প্রতারণার উদ্দেশে তৈরি করা হয়েছে। নজরুল সাহেব তার স্ত্রীকে স্বান্তনা দিতে থাকলেন আর এক হাজার টাকায় কেনা শাড়ির প্যাকেটটি জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিলেন।

<

Related Posts

4 Comments

মন্তব্য করুন